হালাল মাংস কি মানবিক? বিধান, তায়্যিব ও আধুনিক বাস্তবতা
হালাল জবাইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাণীর প্রতি দয়া ও দ্রুততম উপায়ে কষ্টহীন মৃত্যু নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাণিজ্যিক পশুপালনের যুগে সেই মাংস কি এখনও বাস্তবিক অর্থে মানবিক ও নৈতিক?
16 মিনিটের পড়া

সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইসলামিক বিধান অনুযায়ী জবাইয়ের তাত্ত্বিক লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ ইহসান ও করুণা প্রদর্শন করে প্রাণীকে দ্রুত কষ্টমুক্ত করা। তবে আধুনিক বাণিজ্যিক পশুপালনে (ফ্যাক্টরি ফার্মিং) প্রাণীর যে চরম নিপীড়ন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে, তা ইসলামের ‘তায়্যিব’ (পবিত্র ও কল্যাণকর) এবং ‘রহমত’ নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় অনেক গবেষকের মতে এই প্রক্রিয়াজাত মাংস পুরোপুরি মানবিক বা নৈতিক নয়।
মূল বিষয়
- ইসলামী জবাইয়ের মূল লক্ষ্য প্রাণীকে সর্বনিম্ন যন্ত্রণায় দ্রুততম উপায়ে নিঃশেষ করা, যা ধারালো অস্ত্র এবং ইহসানের শর্তের সাথে যুক্ত।
- কোরআনে হালাল হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ‘তায়্যিব’ (পবিত্র, নির্মল ও ন্যায়সংগত) হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা নিছক জবাইয়ের রীতির চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
- আধুনিক ফ্যাক্টরি ফার্মিং ও বাণিজ্যিক খামারের চরম নিষ্ঠুরতা ইসলামের আমানত, খিলাফাহ এবং লা দরার (ক্ষতি না করার) মূলনীতির পরিপন্থী।
- জবাইয়ের পূর্বে অবশকরণ বা স্টানিং নিয়ে সুন্নি ও শিয়া ফিকহের মাঝে শর্তসাপেক্ষ বৈধতা ও মতপার্থক্য রয়েছে, যেখানে মূল উদ্দেশ্য প্রাণীর কষ্ট লাঘব।
- অনেক আধুনিক ফকিহ ও গবেষকের মতে, যে ব্যবস্থায় প্রাণীর অধিকার ও পরিবেশের চরম ক্ষতি সাধিত হয়, সেখান থেকে প্রাপ্ত মাংসের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রারম্ভিক বিবেচনা: ইসলামী জবাইয়ের দর্শন ও প্রাণী কল্যাণের মূলনীতি
বিশ্বজুড়ে মাংস উৎপাদনের আধুনিকীকরণ এবং ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত মৌলিক ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন প্রায়শই উত্থাপিত হয়: হালাল মাংস কি বাস্তবিক অর্থেই মানবিক? এই প্রশ্নের সুবিচারপূর্ণ উত্তর খুঁজতে গেলে ইসলামে প্রাণী অধিকারের মৌলিক দর্শন ও ব্যবহারিক বিধানের গভীর সমন্বয় অনুধাবন করা অপরিহার্য। ইসলামে প্রাণীদের নিছক মানুষের অবাধ ভোগের জন্য সৃষ্ট কোনো জড়বস্তু বা সংবেদনহীন পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং পবিত্র কোরআনে সূরা আল-আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণী এবং ডানায় ভর করে ওড়া প্রতিটি পাখি মানুষের মতোই স্বতন্ত্র জাতি বা সম্প্রদায়ভুক্ত (উমামুন আমছালুকুম)। সৃষ্টিজগতের এই অন্তর্নিহিত সম্মান ও অস্তিত্বগত মর্যাদা স্বীকার করে নেওয়াই হলো ইসলামী নীতিশাস্ত্রের মূলভিত্তি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইসলামী জবাই পদ্ধতি (যবাহ বা জাবহ) প্রণীত হয়েছিল এমন এক যুগে, যখন প্রাক-ইসলামী আরবে এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে প্রাণীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুর আচরণ করা হতো। তখন জীবন্ত পশুর শরীর থেকে মাংস কেটে খাওয়া বা পশুকে ঝুলিয়ে রেখে ধীরে ধীরে যন্ত্রণাদায়কভাবে হত্যা করার মতো বর্বর প্রথা প্রচলিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই সমস্ত নিষ্ঠুরতার কঠোর অবসান ঘটিয়ে প্রাণীর দ্রুততম ও সর্বনিম্ন যন্ত্রণাময় মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা নির্ধারণ করেন। সহীহ মুসলিমের ১৯৫৫ নম্বর হাদিসে শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিষয়ে ‘ইহসান’ (সর্বোত্তম দয়া ও উৎকর্ষ) প্রদর্শন করা আবশ্যক করেছেন; অতএব তোমরা যখন জবাই করবে, তখনো সর্বোত্তম উপায়ে জবাই করো, তোমাদের ছুরি ধারালো করে নাও এবং জবাইকৃত প্রাণীকে স্বস্তি দান করো।' এই নির্দেশনার মাধ্যমে জবাই কেবল একটি ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাণী কল্যাণের একটি বাধ্যতামূলক সনদে রূপ নেয়।
ফিকহ শাস্ত্রের চিরায়ত নীতিমালায় মূলত শ্বাসনালী (ট্রাকিয়া), খাদ্যনালী (ইসোফেগাস) এবং রক্তবাহী প্রধান দুটি নালী (ক্যারোটিড ধমনী ও জগুলার ভেইন) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কাটার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক যুক্তি হলো, এই প্রধান রক্তনালীগুলো একসঙ্গে কেটে ফেললে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং মারাত্মক রক্তচাপ পতনের ফলে প্রাণী অতি দ্রুত চেতনা হারায়, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না। চিরায়ত শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদ্ধতিটিকে তার সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রগতিশীল ও মানবিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ধারালো ছুরি ব্যবহারের কঠোর নির্দেশ, অন্য পশুর চোখের সামনে ছুরি ধারালো না করা এবং জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত পশুকে শান্তভাবে নিয়ে যাওয়ার বিধানগুলো ছিল তৎকালীন সভ্যতায় এক অভূতপূর্ব প্রাণী অধিকারের দৃষ্টান্ত।
তবে সমকালীন বাস্তবতায় একটি বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে শাস্ত্রীয় জবাইয়ের আদর্শ এবং আধুনিক গণ-উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যেভাবে মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেখানে জবাইয়ের মুহূর্তটি কেবল একটি বিশদ ও জটিল উৎপাদন চক্রের সর্বশেষ কয়েকটি সেকেন্ড মাত্র। প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রাণীটির জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো জীবনটিই অমানবিক নিপীড়ন ও বন্দিদশার মধ্য দিয়ে কেটেছে, তার গলায় ধারালো ছুরি চালিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রাণ সংহার করলেই কি সেই মাংস স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'মানবিক' আখ্যা পেতে পারে? তাই নিছক আনুষ্ঠানিক রীতির বাইরে গিয়ে ইসলামে মাংসের নৈতিক বৈধতাকে একটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
‘হালাল’ বনাম ‘তায়্যিব’: আইনি বৈধতা ও সামগ্রিক নৈতিকতার দ্বৈরথ
ইসলামী খাদ্য দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৈপ্লবিক ভিত্তি হলো কোরআনে বারবার উচ্চারিত যুগ্ম পরিভাষা: ‘হালালান তায়্যিবা’ (বৈধ ও পবিত্র)। সূরা আল-বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সমগ্র মানবজাতিকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও তায়্যিব রয়েছে, তা থেকে আহার করো।' কিন্তু আধুনিক বাণিজ্যিক যুগে এসে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক হালাল প্রত্যয়ন (Halal Certification) ব্যবস্থা মূলত ‘হালাল’ অংশের বাহ্যিক ও আইনি শর্ত পূরণ করতেই ব্যস্ত, যেখানে কোরআনের দ্বিতীয় অবিচ্ছেদ্য শর্ত ‘তায়্যিব’ প্রায় সম্পূর্ণভাবেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। হালাল নির্দেশ করে সেই সর্বনিম্ন আইনি সীমারেখা যা সরাসরি নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু তায়্যিব নির্দেশ করে সেই সামগ্রিক অবস্থাকে যা পবিত্র, বিশুদ্ধ, কল্যাণকর, পরিবেশবান্ধব এবং যেকোনো ধরনের শোষণ, জুলুম ও প্রতারণা থেকে মুক্ত।
ফিকহের আনুষ্ঠানিক নিয়মানুযায়ী, কোনো পশুর গলায় আল্লাহর নাম নিয়ে নির্ধারিত নিয়মে ছুরি চালানো হলে তার গোশত প্রযুক্তিগতভাবে খাওয়ার উপযোগী বা ‘হালাল’ হিসেবে ফতোয়া পেতে পারে। কিন্তু সেই পশুটি যদি জন্মের পর থেকে আলো-বাতাসহীন সংকীর্ণ খাঁচায় আবদ্ধ থাকে, কৃত্রিম হরমোন ও রাসায়নিক খাইয়ে তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত স্ফীত করা হয় এবং তার ওপর অবিরত মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালানো হয়, তবে সেই মাংসকে পবিত্র কোরআনের সংজ্ঞায় ‘তায়্যিব’ বলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইমাম আল-গাজ্জালী (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘ইহয়া উলুমিদ্দীন’-এ সুক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, বাহ্যিক ফতোয়ার বিচারে যা জায়েজ বা বৈধ প্রতীয়মান হয়, অভ্যন্তরীণ তাকওয়া, আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা এবং ইহসানের মানদণ্ডে তা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ বা মাকরুহ হতে পারে। অন্যায় ও নিষ্ঠুরতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে আসা খাদ্য কখনো মুমিনের আত্মিক সুস্থতা বয়ে আনতে পারে না।
অতএব, হালাল মাংসের মানবিকতার বিচার কেবল রক্ত ঝরানোর কয়েকটি সেকেন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা একটি মারাত্মক ধর্মীয় সংকীর্ণতা। ইসলামী শরিয়াহর বিখ্যাত মূলনীতি হলো 'মা লা ইয়াতিম্মুল ওয়াজিবু ইল্লা বিহী ফাহুয়া ওয়াজিব'—অর্থাৎ যা ব্যতীত একটি ওয়াজিব পূর্ণতা পায় না, তাও ওয়াজিব হিসেবে গণ্য। যদি সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং জুলুম প্রতিরোধ করা ইসলামের ওয়াজিব বিধান হয়, তবে জবাইয়ের পূর্ববর্তী লালন-পালন, খাদ্য প্রদান, বাসস্থান এবং পরিবহনের প্রতিটি ধাপে প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করাও শরিয়াহর দৃষ্টিতে সমভাবে বাধ্যতামূলক। কেবল প্যাকেটের ওপর একটি সিল দেখে আত্মতুষ্টি লাভ করা কোরআনের সামগ্রিক তায়্যিব দর্শনের সাথে পুরোপুরি অসংগতিপূর্ণ।
আধুনিক ফ্যাক্টরি ফার্মিং ও শিল্পভিত্তিক পশুপালন: রহমত ও ইহসানের সংকট
আজকের বৈশ্বিক বাজারে মুসলিমরা যে হালাল লেবেলযুক্ত মাংস ক্রয় করেন, তার সিংহভাগই উৎপন্ন হয় নিবিড় বাণিজ্যিক পশুপালন ব্যবস্থা বা কনফাইনড অ্যানিম্যাল ফিডিং অপারেশনস (CAFOs)-এর মাধ্যমে, যা সাধারণত ‘ফ্যাক্টরি ফার্মিং’ নামে পরিচিত। এই শিল্পায়িত খামারগুলোতে প্রাণীদের কোনো অনুভূতিশীল সৃষ্টি হিসেবে দেখা হয় না, বরং তাদের বিবেচনা করা হয় দ্রুত মুনাফা অর্জনের জন্য যান্ত্রিক উপাদানের মতো। ব্রয়লার মুরগিগুলোকে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এত দ্রুত ও অস্বাভাবিকভাবে বড় করা হয় যে, তাদের ভঙ্গুর হাড় ও পা নিজের অতিরিক্ত শরীরের ওজন সহ্য করতে পারে না। ফলে লাখ লাখ মুরগি পঙ্গু হয়ে নিজেদের বর্জ্যের ওপর পড়ে থাকে এবং তীব্র যন্ত্রণায় ভুগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়।
গরু, ভেড়া ও ছাগলের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। দুধের খামারে জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নবজাতক বাছুরকে তার মায়ের কাছ থেকে বলপূর্বক আলাদা করা হয়, যাতে মানুষের জন্য দুধ সংরক্ষণ করা যায়। মায়ের এই সন্তান হারানোর গভীর শোক ও দিনের পর দিন বুকফাটা আর্তনাদ কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষেই মানবিক বলে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাখ লাখ জীবিত পশুকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা ব্রাজিল থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট জাহাজে গাদাগাদি করে তোলা হয়। এই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অতিরিক্ত তাপ, মলমূত্রের অ্যামোনিয়া গ্যাস, তীব্র রোগজীবাণু ও ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়ে হাজার হাজার প্রাণী জাহাজের ডেকের মধ্যেই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে এবং তাদের মৃতদেহ সাগরে নিক্ষেপ করা হয়।
এই পুরো বাণিজ্যিক কাঠামোটি ইসলামের মৌলিক নীতি 'রহমাতুল্লিল আলামিন' (সমগ্র জগতের জন্য করুণা) এবং 'লা দরার ওয়ালা দিরার' (কারো ক্ষতি করো না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না—সুনান ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)-এর স্পষ্ট পরিপন্থী। সুনান আবি দাউদের ২৫৪৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার একটি উটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলেন প্রাণীটির পিঠ ও পেট ক্ষুধার চোটে এক হয়ে গেছে; তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে সতর্ক করলেন: 'এই অবলা ও বোবা প্রাণীদের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।' এমনকি সুনান আন-নাসায়ীর ৪৪৪৬ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একটি চড়ুই পাখিকে হত্যা করে, কিয়ামতের দিন সেই পাখি আল্লাহর আরশের নিচে দাঁড়িয়ে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবি জানাবে। যদি একটি ক্ষুদ্র পাখির অবিচারের জন্য কিয়ামতে জবাবদিহি করতে হয়, তবে শতকোটি প্রাণীর ওপর আজীবন চলা কাঠামোগত নিষ্ঠুরতাকে কীভাবে শরিয়াহসম্মত বলা যেতে পারে?
৭০%+
বিশ্বে বাণিজ্যিক বন্দিদশায় উৎপাদিত মাংসের অনুপাত
১৪০+
আধুনিক যান্ত্রিক লাইনে প্রতি মিনিটে জবাই হওয়া মুরগি
০%
ব্যাটারি কেজে প্রাণীর স্বাভাবিক সহজাত আচরণ প্রকাশের সুযোগ
- চরম সংকীর্ণ স্থানে আবদ্ধ রাখা, যার ফলে প্রাণীরা ডানা মেলা বা হাঁটার ন্যূনতম সুযোগ পায় না।
- বাণিজ্যিক স্বার্থে চেতনানাশক ছাড়াই মুরগির ঠোঁট ছাঁটাই (debeaking) এবং গরুর শিং বা লেজ কেটে ফেলা।
- দুগ্ধ খামারে বারবার কৃত্রিম গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবের পর মা ও সন্তানকে তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্নকরণ।
- ডিম শিল্পে অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় কোটি কোটি একদিনের পুরুষ মুরগির ছানাকে জীবন্ত পিষে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা।
জবাই পূর্ববর্তী অবশকরণ (Stunning): বিজ্ঞান, সুন্নি ও শিয়া ফিকহের তুলনামূলক পর্যালোচনা
আধুনিক মাংস প্রক্রিয়াকরণে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হলো জবাইয়ের পূর্বে পশুকে অচেতন বা সংজ্ঞাহীন করা, যাকে পরিভাষায় ‘প্রি-স্লটার স্টানিং’ (Pre-slaughter Stunning) বলা হয়। প্রাণী কল্যাণ বিজ্ঞানীদের মতে, সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অচেতন করা হলে পশুর মস্তিষ্কে ব্যথানুভূতি বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গলায় ধারালো ছুরি চালানোর মুহূর্তে বা রক্তক্ষরণের সময় প্রাণীটি কোনো শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব করে না। তবে মুসলিম বিশ্বে এই পদ্ধতিটি নিয়ে গভীর ফিকহি মতভেদ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিদ্যমান। সনাতন আলেমদের প্রধান ভীতি হলো, অচেতন করার প্রক্রিয়ায় যদি পশুর মৃত্যু ঘটে থাকে, তবে সেই পশুটি ‘মায়তাত’ (মৃত প্রাণী) হিসেবে গণ্য হবে, যা কোরআনের স্পষ্ট বিধানে সম্পূর্ণ হারাম।
সুন্নি ফিকহের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ফতোয়া কাউন্সিল—যেমন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ড, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চ এবং যুক্তরাজ্যের হালাল ফুড অথরিটি (HFA)—শর্তসাপেক্ষ স্টানিংকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছে। তাদের মূল শর্ত হলো: স্টানিং পদ্ধতিটি অবশ্যই ‘রিভার্সিবল’ বা বিপরীতমুখী হতে হবে; অর্থাৎ পশুকে আঘাত করার পর যদি জবাই না করা হয়, তবে নির্দিষ্ট সময় পর পশুটি যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক অবশকরণ (Head-only Electrical Stunning) মুরগি ও ছোট পশুর ক্ষেত্রে বহুলভাবে অনুমোদিত, কারণ এতে পশুর হৃৎস্পন্দন সচল থাকে এবং জবাইয়ের মুহূর্তে প্রাণী জীবিত থাকে। তবে দেওবন্দি ঘরানার বেশিরভাগ আলেম এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাদী ফকিহরা কোনো ধরনের স্টানিং ছাড়াই সরাসরি জবাইকে অগ্রাধিকার দেন, কারণ তাঁদের মতে এটিই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মূল সুন্নাহ এবং এতে ভুলবশত পশু মারা যাওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না।
শিয়া জাফরি ফিকহেও পশুকে জবাইয়ের সময় জীবিত থাকা এবং স্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হওয়াকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শীর্ষস্থানীয় শিয়া মারজা বা মুজতাহিদগণের (যেমন আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানি এবং মরহুম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি) আইনি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যদি বৈজ্ঞানিকভাবে এটি অকাট্যভাবে নিশ্চিত করা যায় যে অচেতন করার ফলে প্রাণীর মৃত্যু ঘটেনি এবং ধারালো অস্ত্র চালানোর সময় পশুর মধ্যে জীবনীশক্তি বিদ্যমান ছিল ও রক্ত স্বাভাবিক চাপে প্রবাহিত হয়েছে, তবে সেই মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে শিয়া ফিকহেও সংশয় বা সন্দেহ এড়ানোর জন্য সনাতন সরাসরি জবাইকে অধিক নিরাপদ ও পছন্দনীয় মনে করা হয়। উভয় মাজহাবের গবেষকরাই একমত যে, আধুনিক হাই-স্পিড স্লটারহাউসে যেখানে প্রতি ঘণ্টায় শত শত গরু বা হাজার হাজার মুরগি জবাই করা হয়, সেখানে স্টানিং ছাড়া প্রতিটি পশুর ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় মানবিক শর্ত ও ধীরস্থিরভাবে ছুরি চালানো নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
| পদ্ধতি | ফিকহি গ্রহণযোগ্যতা | প্রাণী কল্যাণের সুবিধা | নৈতিক ও ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা |
|---|---|---|---|
| সনাতন হস্তচালিত জবাই (Manual Halal) | সর্বসম্মতভাবে বৈধ (যদি সকল শাস্ত্রীয় শর্ত পূর্ণ হয়) | সঠিক দক্ষতায় ও অত্যন্ত ধারালো ছুরিতে সম্পন্ন হলে দ্রুত সংজ্ঞাহীন হয় | আধুনিক গণ-কারখানায় ভীতিকর পরিবেশ, ধস্তাধস্তি ও অদক্ষতায় তীব্র যন্ত্রণার ঝুঁকি থাকে |
| রিভার্সিবল বৈদ্যুতিক স্টানিং (Electric Stun) | আন্তর্জাতিক বহু ফতোয়া কাউন্সিল কর্তৃক শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত | জবাইকালীন ভয় ও তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা তাৎক্ষণিকভাবে রোধ করে | ভোল্টেজ অনিয়ন্ত্রিত হলে জবাইয়ের পূর্বেই পশু মারা গিয়ে মায়তাত হওয়ার আশঙ্কা |
| ক্যাপটিভ বোল্ট স্টানিং (বড় পশুর ক্ষেত্রে) | কিছু আধুনিক আলেমের মতে বৈধ, তবে অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য | বৃহৎ পশুর ক্ষেত্রে মুহূর্তের মধ্যে গভীর সংজ্ঞাহীনতা তৈরি করে | মাথার খুলিতে মারাত্মক আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মৃত্যুর প্রবল ঝুঁকি থাকে |
| যান্ত্রিক রোটারি ব্লেড (Mechanical Slaughter) | তীব্র বিতর্কিত; বহু আলেমের মতে মাকরুহ বা স্পষ্টভাবে না-জায়েজ | বিপুল বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণ ও দ্রুত প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম | প্রতিটি পশুর জন্য আলাদা তাকবির না থাকা এবং ব্যক্তিগত ইহসানের অভাব |
পরিবেশগত বিপর্যয়, অপচয় (ইসরাফ) এবং ফাসাদ ফিল আরদ
মাংসের মানবিকতার আলোচনা কোনো বিচ্ছিন্ন আইনি বিধান নয়; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত নীতিশাস্ত্রের অংশ। ইসলামে মানুষের পরিচয় হলো ‘খলিফা’ বা আল্লাহর প্রতিনিধি, যার ওপর এই পৃথিবীকে সুষম ও সুন্দর রাখার পবিত্র আমানত অর্পণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে আদেশ করেছেন: 'তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় (ইসরাফ) করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' আধুনিক নিবিড় পশুপালন ব্যবস্থা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অপচয়ী ও অদক্ষ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাগুলোর অন্যতম। মাত্র এক কেজি গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য হাজার হাজার লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং বিপুল পরিমাণ দানাদার শস্য অপচয় করা হয়, যা সরাসরি মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে পৃথিবীর ক্ষুধা বহুলাংশে নির্মূল করা সম্ভব হতো।
অধিকন্তু, পবিত্র কোরআনের সূরা আর-রূমের ৪১ নম্বর আয়াতে এক মর্মস্পর্শী সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে: 'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় (ফাসাদ) ছড়িয়ে পড়েছে।' জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুসারে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১৪.৫ শতাংশ আসে বাণিজ্যিক পশুপালন খাত থেকে, যা বিশ্বের সমস্ত যানবাহন ও পরিবহন ব্যবস্থার সম্মিলিত নির্গমনের চেয়েও বেশি। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনাঞ্চল উজাড় করার প্রধানতম কারণ হলো গবাদি পশুর জন্য চারণভূমি তৈরি এবং তাদের খাবারের জন্য সয়াবিন চাষ। বাণিজ্যিক পশুর বর্জ্য থেকে নির্গত মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলকে অতিমাত্রায় উত্তপ্ত করছে এবং তাদের মলমূত্র নদী-নালা ও ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে।
যখন একজন বিশ্বাসী মুসলিম এমন শিল্পায়িত উৎস থেকে মাংস ক্রয় করেন যা ধরিত্রীকে ধ্বংস করছে, অরণ্য উজাড় করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার পরিবেশকে বিপন্ন করছে, তখন তিনি প্রকারান্তরে সেই 'ফাসাদ ফিল আরদ' (পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও পরিবেশ ধ্বংস)-এর অংশীদার হয়ে উঠছেন। পরিবেশগত ভারসাম্য বা ‘মিজান’ বিনষ্ট করা ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতএব, একটি খাদ্য উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় যদি পৃথিবীর ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ে এবং আল্লাহর সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, তবে নিছক মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে পশু জবাই করলেই সেই ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পবিত্র ও নির্দোষ দাবি করা যায় না।
সমকালীন আলেমদের ফিকহি বিতর্ক: মুবাহ বনাম নৈতিক বর্জন ও ইহতিয়াত
ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি স্বতঃসিদ্ধ প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো: 'আল-আসলু ফিল আশয়ায়ি আল-ইবাহাহ'—অর্থাৎ বস্তুগত ও পার্থিব লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো বৈধতা (মুবাহ), যতক্ষণ না কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার দলিল পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী সুন্নি ও শিয়া ওলামায়ে কেরামের বৃহৎ অংশ এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যুক্তি দেন যে, সূরা আল-মায়িদাহর ১ নম্বর আয়াতে গবাদি পশুর মাংস খাওয়াকে স্পষ্টভাবে হালাল বা মুবাহ ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং, আধুনিক খামারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় নৈতিক ত্রুটি বা নিষ্ঠুরতা থাকলেও, যদি জবাইয়ের সময় নির্ধারিত রীতিনীতি মানা হয়, তবে সেই মাংসকে ধর্মীয়ভাবে ‘হারাম’ ঘোষণা করার অধিকার কারো নেই। তাঁদের মতে, খামারগুলোর অমানবিক পরিবেশের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পাপী হবেন, কিন্তু মাংসটি স্বয়ং অপবিত্র বা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না।
তবে অপরপক্ষে, সমকালীন মুসলিম চিন্তাবিদ ও গবেষকদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধারা ‘ইহতিয়াত’ (সতর্কতামূলক পরিহার) এবং ‘সদ্দে যারিয়া’ (অকল্যাণের পথ রুদ্ধ করা)-এর আইনি নীতির আলোকে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। মরহুম আল্লামা বি. এ. আল-হাফিজ মাসরি—যিনি বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী প্রাণী অধিকার নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন—তাঁর বিভিন্ন রচনায় অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিক ফ্যাক্টরি ফার্মিং যেভাবে প্রাণীর ওপর কাঠামোগত নির্যাতন চালায়, তা ইসলামের 'রহমত', 'ইহসান' এবং 'লা দরার' নীতির সরাসরি পরিপন্থী। সমকালীন বহু আলেম মত প্রকাশ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন যে তাঁর কেনা মাংসের পেছনে অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ রয়েছে, তবে সেই অন্যায্য বাজার ব্যবস্থার বয়কট করা এবং উদ্ভিজ্জ জীবনধারা বেছে নেওয়া তাকওয়া ও ধার্মিকতার বিচারে বহুগুণ শ্রেয়।
এখানে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলামে মাংস খাওয়াকে কখনোই কোনো 'ফরজ' (বাধ্যতামূলক) বা 'ওয়াজিব' বিধান করা হয়নি; এটি নিছক একটি অনুমতি বা ‘রুকসত’। আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে অত্যন্ত পরিমিত মাংস গ্রহণ করতেন এবং তাঁর পবিত্র জীবনাচরণের মূল ভিত্তি ছিল চরম সংযম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একাধিক বর্ণনায় এসেছে যে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) উল্লেখ করেছেন যে তাঁদের ঘরে টানা দুই মাস এমনও অতিবাহিত হতো যখন কোনো রান্নার আগুন জ্বলত না; তাঁদের প্রধান খাদ্য ছিল কেবল খেজুর ও পানি। মাংস ছিল মূলত সামাজিক মেহমানদারি বা বিশেষ উৎসবের খাবার, যা আধুনিক যুগের মতো প্রতিটি বেলা বা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত ছিল না।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার বাজারে এক ব্যক্তিকে প্রতিদিন মাংস কিনতে দেখে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন: 'তুমি কি যখনই কিছু খেতে ইচ্ছা করে তখনই তা কিনে ফেলো? তোমরা মাংসের লোভ থেকে সতর্ক থাকো, কারণ মদের নেশার মতো এতেও এক ধরনের বিধ্বংসী আসক্তি রয়েছে' (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস ১৭৪২)। অতএব, কোনো মুসলিম যদি সমকালীন পশুপালন শিল্পের অমানবিকতা, নিজের সুস্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশ সংরক্ষণের মহান উদ্দেশ্যে সচেতনভাবে নিরামিষাশী বা সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ খাদ্য গ্রহণ করেন, তবে তিনি কোনোভাবেই শরিয়াহর সীমা লঙ্ঘন করছেন না। বরং তিনি সুন্নাহসম্মত সংযম, ইহসান এবং সৃষ্টির প্রতি গভীর সহানুভূতির পথেই অবিচল রয়েছেন।
সচেতন মুসলিমের ব্যবহারিক করণীয়: ইনসাফ ও করুণার পুনরুদ্ধার
হালাল মাংস কি মানবিক—এই সামগ্রিক অনুসন্ধানের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে প্রতিটি সচেতন মুসলিমের সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় তা হলো: একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি হিসেবে আধুনিক খাদ্য ব্যবস্থার এই সংকটে আমাদের বাস্তব পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত? প্রথম ও সর্বপ্রধান পদক্ষেপ হলো আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খাদ্যাভ্যাসে গভীর সংযম ফিরিয়ে আনা। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে আমরা যেভাবে প্রতিদিনের প্রতিটি খাবারে বিপুল পরিমাণ মাংস খাওয়াকে সামাজিক মর্যাদা বা অপরিহার্যতায় পরিণত করেছি, তা অবিলম্বে বর্জন করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত কয়েক দিন সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ আহার গ্রহণ করা এবং মাংসের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনা শিল্পভিত্তিক খামারগুলোর অমানবিক চাহিদাকে সংকুচিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী অহিংস হাতিয়ার।
দ্বিতীয়ত, যদি কেউ মাংস গ্রহণ করতেই চান, তবে অন্ধভাবে কেবল প্যাকেটের ওপর আঁকা কোনো হালাল লোগো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করতে হবে। আমাদের হালাল প্রত্যয়নকারী সংস্থাগুলোর ওপর নাগরিক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা সার্টিফিকেটের পরিধি কেবল জবাইয়ের ছুরির কয়েক সেকেন্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে পশুর সামগ্রিক জীবনযাত্রার কল্যাণ, মুক্ত চারণের সুযোগ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তার সাথে যুক্ত করে। স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষক যারা প্রাণীদের খোলা মাঠে প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্মান ও ভালোবাসার সাথে লালন-পালন করেন, তাদের কাছ থেকে জৈব (organic) ও মুক্ত চারণের মাংস সংগ্রহ করা একটি চমৎকার ইতিবাচক বিকল্প হতে পারে, যা কোরআনের তায়্যিব চেতনার সাথে শতভাগ সংগতিপূর্ণ।
পরিশেষে, আহার নির্বাচন কোনো মামুলি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার। শেষ বিচারের দিনে মহান রব্বুল আলামিন আমাদের জিজ্ঞেস করবেন আমরা তাঁর সৃষ্টিজগতের দুর্বল ও অবলা প্রাণীদের সাথে কেমন আচরণ করেছি এবং পার্থিব নেয়ামতের ব্যবহার কীভাবে করেছি। যে খাদ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অসহায় প্রাণীর আজীবন রুদ্ধশ্বাস যন্ত্রণা, ধরিত্রীর বনাঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞ এবং শ্রমিকদের রক্তঘাম, সেই খাদ্য কখনো একজন মুমিনের অন্তরে নূর ও আত্মিক প্রশান্তি এনে দিতে পারে না। তাই আসুন, নিছক আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে করুণা, ইনসাফ ও তায়্যিবের সমন্বয়ে একটি মানবিক ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা প্রত্যেকে সচেষ্ট হই।
সাধারণ প্রশ্ন
ইসলামে জবাই করার পূর্বে পশুকে অবশ বা সংজ্ঞাহীন করা (stunning) কি অনুমোদিত?
হ্যাঁ, বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ প্রখ্যাত ফতোয়া কাউন্সিল (যেমন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল) শর্তসাপেক্ষে অবশকরণকে বৈধ বলেছে। মূল শর্ত হলো প্রক্রিয়াটি যেন এমন হয় যাতে পশুর মৃত্যু না ঘটে এবং জবাইয়ের মুহূর্তে প্রাণীর হৃৎস্পন্দন সক্রিয় থাকে। যদি অবশ করার কারণে জবাইয়ের আগেই পশুর মৃত্যু হয়, তবে সেই মাংস মায়তাত বা হারাম হয়ে যাবে।
বাণিজ্যিক খামার বা ফ্যাক্টরি ফার্মিংয়ের হালাল মাংস কি সম্পূর্ণ নৈতিক?
ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে জবাইয়ের আইনি শর্ত পূরণ হলে সেই মাংস প্রযুক্তিগতভাবে খাওয়া বৈধ (মুবাহ)। তবে কোরআনের ‘তায়্যিব’ নীতি এবং প্রাণীর প্রতি আজীবন নির্মম আচরণের প্রেক্ষাপটে বহু সমকালীন গবেষক মনে করেন, ফ্যাক্টরি ফার্মিং থেকে প্রাপ্ত মাংস নৈতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং তা ইসলামের উচ্চতর ইহসান ও রহমতের পরিপন্থী।
একজন মুসলিম কি সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জভোজী বা ভেগান (Vegan) হতে পারেন?
হ্যাঁ, একজন মুসলিম সম্পূর্ণ নিরামিষাশী বা উদ্ভিজ্জভোজী হতে পারেন। ইসলামে মাংস খাওয়া মুবাহ বা অনুমোদিত, কিন্তু এটি ফরজ বা আবশ্যকীয় কোনো ইবাদত নয়। প্রাণীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন, সুস্বাস্থ্য রক্ষা কিংবা পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়তে মাংস পরিহার করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ও প্রশংসনীয়।
কোরআনে হালাল এবং তায়্যিবের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
‘হালাল’ নির্দেশ করে শরিয়াহর আইনি সীমারেখাকে যা সরাসরি নিষিদ্ধ নয় এবং যার আনুষ্ঠানিক শর্ত পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ‘তায়্যিব’ হলো যা পবিত্র, নির্মল, কল্যাণকর, পুষ্টিকর এবং কোনো প্রকার জুলুম, শোষণ বা পরিবেশের ক্ষতি থেকে মুক্ত। কোরআনে শুধুমাত্র হালাল নয়, বরং ‘হালালান তায়্যিবা’ খাদ্য গ্রহণের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কি প্রতিদিন মাংস খেতেন?
না, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো প্রতিদিন মাংস খেতেন না। সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর ঘরে টানা দুই মাস কোনো চুলা জ্বলত না এবং তাঁরা মূলত খেজুর ও পানির ওপর নির্ভর করতেন। মাংস খাওয়া ছিল মূলত সামাজিক মেহমানদারি বা বিশেষ উৎসবের বিরল খাবার।
একটি পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা কি ইসলামে জায়েজ?
না, একটি পশুর চোখের সামনে অন্য পশুকে জবাই করা কিংবা পশুর সামনে ছুরি ধারালো করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও মাকরুহ। সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে পশুর সামনে ছুরি ধারালো করতে দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'তুমি কি প্রাণীটিকে দুবার মারতে চাও?'
শিয়া ফিকহে জবাইয়ের সময় অবশকরণ নিয়ে কী অভিমত রয়েছে?
শিয়া জাফরি ফিকহের প্রধান মারজাদের মতে, জবাইয়ের সময় পশুর জীবিত থাকা এবং স্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হওয়া অত্যাবশ্যক। অবশকরণ যদি বিপরীতমুখী হয় এবং পশুর মৃত্যু না ঘটায়, তবে তা নিষিদ্ধ নয়; তবে সন্দেহ পরিহারের জন্য সনাতন সরাসরি জবাইকে অধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এই লেখাটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন ব্যাখ্যা করে; বিধানের জন্য আস্থাভাজন যোগ্য আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
সূত্র
- Sahih Muslim, Book 34, Hadith 1955 (Command to show ihsan in slaughter) — Sunnah.com
- Sunan Abi Dawud, Book 15, Hadith 2549 (Kindness to overworked animals) — Sunnah.com
- Sunan an-Nasa'i, Book 43, Hadith 4446 (Accountability for killing a sparrow) — Sunnah.com
- Muwatta Malik, Book 49, Hadith 1742 (Umar ibn al-Khattab on addiction to meat) — Sunnah.com
- Surah Al-An'am (6:38), Surah Al-Baqarah (2:168), Surah Al-A'raf (7:31), Surah Ar-Rum (30:41) — Quran.com
- Animals in Islam — The Islamic Foundation / Al-Hafiz B.A. Masri. Seminal scholarly treatise examining animal welfare, factory farming, and Islamic legal maxims.
- Tackling Climate Change Through Livestock: A Global Assessment of Emissions and Mitigation Opportunities — Food and Agriculture Organization of the United Nations (FAO)
- Ihya Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences) — Imam Abu Hamid al-Ghazali. Discussion on outer legal rulings (fatwa) versus inner spiritual piety (taqwa and wara').